সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:১৯ অপরাহ্ন

বিলুপ্তির পথে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘হারিকেন’

শুভ গোয়ালা, কুলাউড়া:: / ৩০ শেয়ার
আপডেট : সোমবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২২, ১:৩২ পূর্বাহ্ন

 ‘হারিকেন’ নামটা শুনা মাত্র অনেকের অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি গ্রামীন ঐতিহ্যের প্রতীকগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। বিদ্যুৎবিহীন গ্রামের অন্ধকার দূর করার একমাত্র অবলম্বন ছিল হারিকেনের আলো।

 

হারিকেন হচ্ছে জ্বালানি তেলের মাধ্যমে বদ্ধ কাচের পাত্রে আলো জ্বালাবার ব্যবস্থা। এই অর্ধবৃত্তাকার  বদ্ধ কাচকে বাঙালিরা চিমনি বলে থাকে। এর ভিতর তেল থেকে আলো জ্বালাবার জন্য কাপড়ের শলাকা ব্যবহার করা হয়। ঐ শলাকায় অগ্নি সংযোগের মাধ্যমে আলো পাওয়া যায়। আলো বাড়ানো-কমানোর জন্য বহিরাংশে একটি চাকতি থাকে, যা বাড়ালে কমালে শলাকা উঠা নামার সাথে আলো বাড়ে কমে। এটি বহন করার জন্য বহিরাংশে লোহার একটি ধরুনি থাকে।

 

আধুনিকতার ছোঁয়ায় আর সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে হারিকেন বাতি। একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই আলোর জন্য ব্যবহৃত হতো। হারিকেন জ্বালিয়ে রাতে হাট-বাজারে যেত গ্রামের লোকজন, রাতের আধারে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে একমাত্র ভরসা ছিলো হারিকেন। দোকানদাররা বেচাকেনাও করত হারিকেনের আলোতে। অমাবস্যার রাতে ঘোর অন্ধকারে হারিকেনের আলো জ্বালিয়ে রাস্তা চলার স্মৃতি এখনো অনেক মানুষ মনে করে।

 

 

 

একসময় হারিকেন জ্বালিয়ে বাড়ির উঠানে কিংবা ঘরের বারান্দায় ছোট্ট শিশুরা একসাথে পড়াশোনা করতো। ডাক পিয়নরা চিঠির বোঝা পিঠে করে হাতে হারিকেন নিয়ে ছুটে চলতো।

 

 

 

এখনো গ্রামের কিছু বাড়িতে হারিকেন পাওয়া যেতে পারে, সেগুলো হয়তো ময়লা ও মরিচা পড়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এখন ঘরে ঘরে, হাট-বাজারে, রাস্তা-ঘাটে সর্বত্রই বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানি।প্রযুক্তির উৎকর্ষে হারিকেনের পরিবর্তে স্থান দখল করে নিয়েছে সোলারপ্লান্ট ও বিদ্যুৎ। জ্বালানিখাতে ব্যাপক উন্নয়নে হারিকেন এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানবেও না হারিকেন কী!

 

 

 

প্রথম হারিকেনের বর্ণনা পাওয়া যায় কুলাউড়া থানার আদমপুর গ্রামের গৌরীর কাছে, ছোট থাকতে আমি সন্ধ্যাবেলা হারিকেনের কাচের চিমনি খুলে, ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে কেরোসিন তেল ঢেলে দিয়াশলাই দিয়ে আগুন জ্বালাতাম। অনেক সময় আলো কমানোর জন্য যে চাকতি থাকতো সেটি বেশি ঘুরে গেলে শলাকাটি তেলের ভিতর পড়ে যেতো। সেটা বের করা অনেক কষ্ট ছিলো। কখনো হাতের কেরোসিন লেগে যেতো রান্না করার পাত্রে কিংবা খাবারে, তখন এর জন্য বকুনি খেতাম। হারিকেনের কেরোসিন তেল রাখার জন্য গ্রামের সব বাড়িতেই কাচের ও প্লাস্টিকের বোতলে গলায় রশি লাগিয়ে  বাঁশের খুঁটিতে ঝুলিয়ে রাখা হতো।

 

 

 

কথা হয় ডা.সঞ্জয় গোয়ালার সাথে। তিনি জানান, আমি পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত হারিকেন দিয়ে লেখা-পড়া করেছি। হারিকেন জ্বালিয়ে ধানের খলায় যেতাম। জুরে বাতাস দিলে হাত দিয়ে বাতাস আটকানোর চেষ্টা করতাম যাতে বাতাসে নিভে না যায়। সেগুলো অনেক আনন্দের মুহূর্ত ছিলো। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই হারিকেন আজ বিলুপ্তির পথে।

 

 

 

একই পরিবারের পঞ্চাশ বছর বয়সী বিদ্যা গোয়ালা জানান, আমি আগের একটি হারিকেন রেখে দিয়েছি। বছর খানিক আগে ছোট বাচ্চারা বর্ণমালার বই পড়ছিলো,সেখানে হারিকেনের কথা উল্লেখ ছিলো কিন্তু হারিকেন কি? সেটা বুঝেনা আর  দেখেওনি। পরে আমার রেখে দেওয়া হারিকেন বের করে সেটির সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝিয়ে বলি। এখনো সেটি আছে আমার বাড়িতে।

 

 

 

দোকানদার রিতন পান্ডে জানান, বছর দশেক আগে সন্ধ্যা নামলে জ্বালানি কেরোসিন তেল নেওয়ার জন্য মানুষের  সিরিয়াল থাকতো। দোকানে একজন কর্মী ছিলো শুধু কেরোসিন তেল মাপার জন্য। আর এখন তো পুরো বাজারে মুদির দোকানে কেরোসিন তেল খুঁজে পাওয়া দুস্কর।

 

 

 

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হারিকেন এখন শুধুই স্মৃতি। হয়তো নতুন প্রজন্ম হারিকেন সম্পর্কে জানবে না, পড়তে হবে ইতিহাস। হতেপারে এক সময় হারিকেনেরে দেখা মিলবে বাংলার জাদুঘরে।

 

 

 

বিজ্ঞান প্রযুক্তি, আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম অঞ্চলের সেই ঐতিহ্যবাহী হারিকেন এখন বিলুপ্তির পথে। চার্জার,বৈদ্যুতিক বাতি ও বিদ্যুতের নানা ব্যবহারের ফলে হারিকেনের ব্যবহার আজ আর দেখা যায় না।এখনও দু-এক বাড়িতে হারিকেন পাওয়া গেলেও  ব্যবহার না করায় সেগুলোতে ময়লা ও মরিচা পড়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

 

 

 

জাফলং নিউজ/ডেস্ক/শুভ

 

 


আরও পড়ুন
Theme Created By ThemesDealer.Com